ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা

এইচ এম জহিরুল ইসলাম মারুফ,স্টাফ রিপোর্টার: প্রতিটি প্রানীর জীবন ধারনের জন্য খাদ্য আহরন করতে হয়।মানুষের আহার যোগান দেয়ার জন্য শ্রম দিতে হয়।
আর মানুষ তার নিজের বেঁচে থাকার, পরিবারকে ভরণ-পোষণের, অপরের কল্যাণে এবং সৃষ্টিকুলের উপকারে যে কাজ করে, তাই শ্রম। ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নর-নারী নির্বিশেষে সব মানুষই কোনো না কোনো কাজ করে। আর যে কোনো কাজ করতে গেলেই প্রয়োজন হয় শ্রমের।

"মানুষের উন্নতির চাবিকাঠি হলো শ্রম" 
যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত। সব ধরনের শ্রমিককেই মর্যাদা দিতে হবে। একজন দিনমজুরের শ্রম, কৃষকের শ্রম, শিক্ষকের শ্রম, অফিসারের শ্রম, ব্যবসায়ীর শ্রম- সবই সমান মর্যাদার অধিকারী। শ্রমের মর্যাদা সমাজের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। শ্রমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআন মাজিদে নির্দেশ দিয়েছেন, "অতঃপর যখন নামায শেষ হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো।" (সূত্র-সুরা জুমুআ, আয়াত নং-১০)।

মানুষের প্রয়োজনীয় কোনো কাজই তুচ্ছ নয়, কোনো কাজই নগণ্য নয় এবং যারা এসব কাজ করেন, তারাও হীন নন। ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যধিক। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং জীবিকা অন্বেষণকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।

মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "ফরজ ইবাদতের পর হালাল রুজি অর্জন করাও একটি ফরজ ইবাদত।" (সূত্র-বায়হাকিশরীফ)। 
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন, "তিনি তোমাদের জন্য ভূমি সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তার দেয়া রিজিক থেকে আহার করো।" (সূত্র-সুরা মুলক, আয়াত নং-১৫)।

আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রমকে ভালোবাসতেন। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করেছেন, কাপড়ে তালি লাগিয়েছেন, মাঠে মেষ চরিয়েছেন। নবিজি ব্যবসা পরিচালনাও করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে নিজ হাতে পরিখা খনন করে শ্রমের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "শ্রমিক আল্লাহর বন্ধু।" (সূত্র-বায়হাকি শরীফ)। 
এ ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, "নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই। আল্লাহর নবি হজরত দাউদ আ. নিজের হাতে কাজ করে খেতেন।" (সূত্র-সহিহ বুখারি)।

কুরআন-হাদিস, ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, নবি-রাসূলগণ শ্রমিকদের কত মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলামের চিরন্তন শান্তির আলোয় উদ্ভাসিত ক্রীতদাস হজরত বিলাল রা. মুক্ত মানুষে পরিণত হন। তাঁকে সাহাবায়ে কিরাম 'সাইয়েদুনা' বা আমাদের নেতা বলে সম্বোধন করতেন। তাঁকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিশয় সম্মানজনক মুয়াজ্জিন পদে নিযুক্ত করেন। মক্কা বিজয় করে কাবা ঘরে প্রথম প্রবেশের সময় মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত বেলাল রা. ও আরেক ক্রীতদাস হজরত খাব্বাব রা.-কে সাথে রেখেছিলেন।

নবিজি কখনো নিজ খাদেম হজরত আনাস রা.-কে ধমক দেননি এবং কখনো কোনো প্রকার কটুবাক্য ও কৈফিয়ত তলব করেননি। এ সম্পর্কে হজরত আনাস (রা.) নিজেই বলেন, "আমি দশ বছর যাবৎ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমত করেছি। তিনি আমার সম্পর্কে কখনো উহ! শব্দটিও বলেননি এবং কখনো বলেননি, এটা করোনি কেন? এটা করেছো কেন? আমার অনেক কাজ তিনি নিজ হাতে করে দিতেন।" (সূত্র-সহিহ বুখারি)।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা হজরত ফাতিমা রা. নিজ হাতে জাঁতা পিষে গম গুঁড়ো করতেন এবং রুটি তৈরি করতেন। আর এজন্য তার হাতে জাঁতা ঘুরানোর দাগ পড়ে গিয়েছিল।

কোদাল চালাতে চালাতে একজন সাহাবির হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাত দেখে বললেন, "তোমার হাতের মধ্যে কি কিছু লিখে রেখেছ ? সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এগুলো কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য পাথুরে জমিতে কোদাল চালাতে গিয়ে হাতে এ কালো দাগগুলো পড়েছে। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা শুনে ওই সাহাবির হাতের মধ্যে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সাথে চুমু খেলেন। এভাবে অসংখ্য কর্ম ও ঘটনার মাধ্যমে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

ইসলামি আদর্শের কাছে মনিব-গোলাম, বড়-ছোট, আমীর-ফকির সবাই সমান। ইসলামি সমাজে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সমাজপতি, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদের আলাদাভাবে মর্যাদার একক অধিকারী হওয়ার সুযোগ নেই। অধীনস্থরাও ইনসাফের দাবি করার অধিকার রাখে।

শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তারা (যারা তোমাদের কাজ করে) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। সে (মালিক) যা খায় তার অধীনস্থদেরও যেন তাই খেতে দেয়, সে (মালিক) যা পরিধান করে তাদেরকে যেন তা পরিধান করায়। আর তাকে এমন কর্মভার দেবে না যা তার ক্ষমতার বাইরে। এমন কাজ হলে তাকে (শ্রমিককে) যেন সাহায্য করে।" (সূত্র-সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে তিল তিল করে গড়ে উঠে শিল্প প্রতিষ্ঠান। একটি শিল্পের মালিক শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে অল্প সময়েই পাহাড় পরিমাণ অর্থ-বিত্তের মালিক হয়। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে, তাদের ঠকিয়ে গড়ে তোলে একাধিক শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কারখানায় তাদের কোনো অংশিদারিত্ব থাকে না। এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "মজুরকে তার কাজ হতে অংশ দান করো, কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না।" (সূত্র-মুসনাদে আহমাদ)।

মাসের পর মাস চলে যায় শ্রমিকরা বেতন পায় না। বেতনের দাবিতে শ্রমিককে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়। শ্রমিকের বেতন-ভাতার ব্যাপারে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করো।" (সূত্র-সুনানে ইবনে মাজাহ)। 
আমিন

শেয়ার করুন
পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট