মুফতি ওয়াক্কাস, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দেওবন্দী এমপি ও মন্ত্রী

একটি খবর উদ্ধৃত করে লেখা শুরু করছি। কয়েকদিনের মধ্যে পাঁচটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে। উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে দলীয় ফরম সংগ্রহ করেছেন ১৪১ জন। প্রতি আসনে গড়ে আগ্রহী প্রার্থী ২৮ জন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা জয়ী হন। বাকি ১৪৭ আসনের প্রতিটিতে গড়ে ১৭ জন দলীয় ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে প্রতি আসনের বিপরীতে ১৪ জন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে হওয়া ৫টি আসনের উপনির্বাচনে প্রতি আসনে গড়ে প্রার্থী ছিল ১৫ জন।

অধিক প্রার্থী প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, সাংসদ হওয়া এখন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সরকারি দল হলে জয়ের নিশ্চয়তাও আছে। আর জয়ী হলে এ পদ ব্যবহার করে অনেক-অনেক কিছু করা যায়। যদিও বিধি মোতাবেক আইন প্রণয়নই একজন এমপির মূল কাজ। তার পরও সবাই নিজের খেয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে কেন এমপি হতে চান? এ বিষয়ে সাধারণ মানুষই আপনাকে অসাধারণ সব ব্যাখ্যা দেবে। তাদের কথার সারমর্ম, এমপি হলে নির্বাচনী এলাকার সব আপনার; আপনিই রাজা-বাদশা। নিজের ও বউ-বাচ্চার নামে অথবা বেনামে গাড়ি, প্লট, বাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স থেকে শুরু করে অনেক কিছু করতে পারবেন। সঙ্গে মেলে আরও অনেক সুকীর্তি-কুকীর্তি করার লাইসেন্স।

এই পরিস্থিতির মাঝে আজ এমন একজন রাজনীতিবিদ সম্পর্কে আলোচনা করবো, যিনি তিন-তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। একবার প্রতিমন্ত্রী ও হুইপের দায়িত্ব পালন করেছেন। আরও মজার তথ্য হলো, প্রত্যেকবারই তিনি এমপি হয়েছেন এমন সময়, যখন তার দল কিংবা জোট ক্ষমতায়। তার পরও এখন তিনি চলেন ভাড়া গাড়ীতে। তার নিজের কোনো গাড়ী নেই, ঢাকায় কোনো বাড়ি, প্লট কিংবা ফ্ল্যাট নেই। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দেওবন্দী ধারার আলেম ও মুফতি, যিনি সংসদ সদস্য-মন্ত্রী-হুইপের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস।

কওমি অঙ্গনের এই তপ্ত-উত্তপ্ত সময়ে মুফতি ওয়াক্কাস একটি আলোচিত নাম। হেফাজতে ইসলামের শীর্ষস্থানীয় যে কয়জন নেতা কারাবরণ করেছেন তিনি তাদের অন্যতম। তিনি একজন সাহসী অভিভাবক, বিদগ্ধ শায়খুল হাদিস ও শিক্ষাবিদ। মেধাবী, সৎ, স্পষ্টভাষী এবং অত্যন্ত আশাবাদী একজন মানুষ। সেই সঙ্গে তিনি অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক বটবৃক্ষ। যে বৃক্ষের সাহচর্যে থেকে অসংখ্য মানুষ জ্ঞান আহরণ করেছেন ও করছেন। তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং দেওবন্দী আদর্শে বিশ্বাসী আলেম। হক ও হক্কানিয়্যাত তার ধ্যানজ্ঞান।

সমকালীন সময়ে এটা অনেকটা জোর দিয়েই বলা যায়, অনেক রাজনীতিবিদ সত্য কথা বলতে ভয় পান। কিন্তু তিনি নির্ভয়ে কথা বলেন। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নীতি ও আদর্শে তিনি অটল। তিনি আমাদের মুফতি ওয়াক্কাস। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিষয় নিয়ে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ ও আলেম কিছুটা বিরক্ত এবং হতাশ। একান্ত আলাপচারিতায় এ বিষয়ে তাকে আফসোস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। চলমান সময়ের অস্থিরতা নিরসনে তার ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।

কথা ও ভাষায় কিছুটা কড়া স্বভাবের মুফতি ওয়াক্কাস কওমি সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা। এমপি হিসেবে তিনি ছিলেন সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। এমপিদের বিরুদ্ধে কত রকমের অভিযোগ থাকে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কখনও কোনো অভিযোগ উঠেনি। এমনকি তার সময়কার অনেকে এমপি দুর্নীতির দায়ে জেল খেটেছেন, সম্পদের হিসাব নিয়ে বিভিন্ন অফিসে হাজিরা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে মুফতি ওয়াক্কাস ব্যতিক্রম। তাকে এসব স্পর্শ করেনি। এই মহীরুহের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু।

মুফতি ওয়াক্কাস যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার বিজয়রামপুর গ্রামে ১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। সংসারের কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে মো. ইসমাইল মোড়ল-নূর জাহান বেগম দম্পতির স্নেহ একটু বেশিই পেয়েছেন। যেমন এখন পান সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও শাগরেদদের অবারিত শ্রদ্ধা।
স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সূচনা। শিক্ষাজীবনে তিনি যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তার রীতিমতো বিস্ময়কর। মাদরাসা বোর্ড থেকে দাখিলে (১৯৬৫) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৩য়, আলিমে (১৯৬৭) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১ম, ফাজিলে (১৯৬৯) মাদরাসা বোর্ডে প্রথম শ্রেণিতে মেধা তালিকায় ৩য় ও কামিলে (১৯৭১) মাদরাসা বোর্ডে প্রথম শ্রেণিতে মেধা তালিকায় ৩য় স্থান অর্জন করেন। দাখিল পরীক্ষার অবসরে মাত্র ৩ মাসে কোরআনে কারিম হিফজ করেন। ১৯৭২ সালে মণিরামপুর মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

এরপর মুফতি ওয়াক্কাস তার মুরুব্বি ও মুর্শিদ হজরত মাওলানা তজম্মুল আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন ও সেখানে ৪ বছর অধ্যায়ন করেন। ১৯৭৩ সালে ১ম বিভাগে মওকুফ আলাইহি, ১৯৭৪ সালে দাওরায়ে হাদিস (মেধা তালিকায় ৪র্থ), ১৯৭৫ সালে তাকমিল দ্বীনিয়াত (মেধা তালিকায় ১ম) ও ১৯৭৬ সালে ইফতা (মেধা তালিকায় ১ম) শেষ করে মুফতি সনদ লাভ করেন। সময়ের হিসেবে তিনি দেওবন্দে পড়াশোনার সময় শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও শিক্ষকদের পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি শায়খ তজম্মুল আলী (রহ.)-এর হাতে বায়াত হন এবং ১৯৮৪ সালে খেলাফত লাভ করেন।

দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে শায়খ তজম্মুল আলী (রহ.)-এর পরামর্শে হেড মাওলানা হিসাবে লাউড়ী কামিল মাদরাসায় যোগ দিয়ে ২ বছর শিক্ষকতা করেন। পরে দারুল উলুম খুলনায় (১৯৭৮-১৯৮৬) ৮ বছর শায়খুল হাদিস, নাজেমে তালিমাত ও প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে কিছুদিন ঢাকা মালিবাগের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস ছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যশোরের জামেয়া এজাজিয়া রেলষ্টেশন মাদরাসার শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া নিজের প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ইমদাদিয়া মাদানীনগরের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস। ১৯৮২ সালে জামেয়া ইমদাদিয়া মাদানীনগর প্রতিষ্ঠা করেন মুফতি ওয়াক্কাস। ১৯৮৯ সালে এর বালিকা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৫ সালে বালিকা শাখায় দাওরায়ে হাদিস এবং ২০০৩ সালে বালক শাখায় দাওরায়ে হাদিস চালু হয়। ২০০৯ সালে ইফতা ও ২০১৪ সনে আরবি বিভাগ খোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান।
লেখক-মুফতি এনায়েতুল্লাহ

শেয়ার করুন
পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট